Skip to main content
RASUL NOMA — Naqshbandiyyah Mujaddidiyyah Heritage Portal

Abu Bakr Siddiq (RA)

The Truthful

Metadata

Spiritual predecessor
Prophet Muhammad ﷺ

হে প্রিয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সৃষ্টির স্রষ্টাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না, ততক্ষণ তুমি নিজেই সৃষ্ট জগতের সীমাবদ্ধতার ভেতরেই আবদ্ধ থেকে যাও। তখন তোমার চিন্তা, তোমার আকাঙ্ক্ষা, তোমার ভয় সবই এই সৃষ্টি-জগতের নিয়ম, প্রয়োজন ও ক্ষণস্থায়ীতার অধীন হয়ে থাকে। তুমি তখন বস্তুজগতের মহাব্বতে পড়া এক সত্তা মাত্র; যে সময়, পরিবর্তন ও অভাবের শৃঙ্খলে বাঁধা এক দাস।

কিন্তু যখন তোমার অন্তর জাগ্রত হবে, যখন তুমি স্রষ্টাকে সত্যিকার অর্থে চিনতে ও উপলব্ধি করতে শিখবে,যখন তোমার হৃদয়ের পর্দা উঠে গিয়ে তাঁর অস্তিত্বের নূরে আলোকিত হবে, তখন তোমার অবস্থানই পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন তুমি আর সৃষ্টির বন্দি নও; বরং সৃষ্টি তখন তোমার উপলব্ধির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে। তুমি সৃষ্টিকে দেখো, বুঝো, তার সীমা ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করো কিন্তু তুমি আর তার দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকো না। তখন জগৎ তোমার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে না, বরং জগৎ তোমার উপলব্ধির পরিসরে এসে দাঁড়াবে। তোমার দৃষ্টি বিস্তৃত হবে, তোমার হৃদয় প্রশস্ত হবে, এবং তুমি উপলব্ধি করা সব কিছুর মূল্যায়ন হবে, সেই একক সত্তা, যাঁর অস্তিত্ব ব্যতীত কিছুই স্থির নয়।

এভাবেই আত্মা যখন স্রষ্টার জ্ঞান দ্বারা আলোকিত হবে, তখন সে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে,আর সৃষ্টিই তখন তার জন্য এক চিন্তার পাঠশালা, এক নিদর্শনের জগৎ হয়ে ওঠে।

হযরত কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর (রাঃ) যিনি মদিনা মুনাওয়ারার সাতজন শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও জ্ঞানবিশারদ আলেমের অন্যতম ছইলেন, তিনি তাঁদের মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও তাকওয়ার দিক থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁর অন্তর ইলাহী নূরের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত ছিল, আর তাঁর জীবন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিল। জ্ঞান, ইবাদত, বিনয় ও আল্লাহভীতির এমন অপূর্ব সমন্বয় তাঁর চরিত্রে বিদ্যমান ছিল যে, সমকালীন মানুষ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতেন। বর্ণিত আছে, যখন তাঁর ইন্তিকালের সময় ঘনিয়ে এলো এবং তিনি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন, তখন পবিত্র কাবা শরীফ যেন আধ্যাত্মিক বেদনাভরা ভাষায় বলে উঠল, “হে কাসিম! আমি তোমাকে খুব স্মরণ করব। এই দুনিয়ায় আর তোমাকে দেখতে পাব না।, এটি ছিল তাঁর মর্যাদা, মহব্বত ও আধ্যাত্মিক মহিমার এক অপূর্ব প্রতীক। বলা হয়, তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশে কাবা শরীফ নিজেই পাঁচশত বার তাওয়াফ করেছিল। এ বর্ণনা মূলত তাঁর অসামান্য নৈকট্য, আল্লাহপ্রেম ও রুহানিয়্যাতের গভীরতার প্রতীকী প্রকাশ; যা বুঝিয়ে দেয় যে, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ কেবল মানুষের হৃদয়েই নয়, সমগ্র সৃষ্টিজগতের কাছেও সম্মানিত ও মহিমান্বিত হয়ে থাকেন।

প্রিয় নববী (সাঃ) এর আমানতের উত্তরাধিকার ও কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) এর বরকতময় বংশধারা। শায়খ কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর (রাঃ) ইসলামের প্রথম যুগের এক মহান আলেম ও ফকীহবিদ ছিলেন, যাঁর বংশধারা অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল। পিতার দিক থেকে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর বংশধর ছিলেন, আর মাতার দিক থেকে তিনি সম্পর্কিত হযরত আলী ইবন তালিব (রাঃ) এর পবিত্র বংশধারার সাথে ছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল পবিত্র রমজান মাসের এক বৃহস্পতিবার এক বরকতময় ও নূরানী সময়ে।

বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার দাদা আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হিজরতের সময় মক্কা থেকে মদিনার পথে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সঙ্গে সাওর গুহায় অবস্থান করেছিলেন। সে নির্জন ও সংকটময় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বললেন, তুমি সারা জীবন আমার সঙ্গে থেকেছো, নানা কষ্ট ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়েছ। এখন তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করো, যেন তিনি তোমার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বিনয়ের সাথে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো আমার আত্মার গোপন রহস্য, আমার হৃদয়ের অন্তরতম ভেদ। আমার প্রয়োজন কী, তা আপনি আমার চেয়েও ভালো জানেন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পবিত্র হাত উত্তোলন করে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! যতদিন আমার শরীয়ত কিয়ামত দিবস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ততদিন আপনি এমন বরকত দান করুন যে, তাঁর বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ থাকবেন যারা এই দ্বীন বহন করবে, এর বাহ্যিক বিধান ধারণ করবে এবং এর অন্তর্নিহিত রহস্যের উত্তরাধিকারী হবে। আর তাঁদের মধ্য থেকে এমন পথনির্দেশক সৃষ্টি করুন যারা সঠিক পথের উপর থাকবে এবং অন্যদেরও সেই পথে আহ্বান করবে। এই পবিত্র দোয়া বরকতময় কে সুফি ঐতিহ্যে গভীর অর্থে স্মরণ করা হয়, বিশেষত নকশবন্দী সিলসিলার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে, যেখানে বাহ্যিক শরীয়তের পাশাপাশি অন্তরের গোপন জ্ঞান ও ইহসানের নূরকে বহন করার কথা বলা হয়।

মদিনার আলোকবর্তিকা ইমাম কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রা) এর জ্ঞান, তাকওয়া ও আদর্শ জীবন। মদিনার পবিত্র ভূমিতে যিনি জ্ঞান, ইবাদত ও নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি হলেন ইমাম কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাঃ)। তিনি ছিলেন সাহাবি খলিফা আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর বংশধরদের একজন আলোকিত নক্ষত্র, যিনি তাঁর যুগে মদিনায় “আবু মুহাম্মদ” নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্যে মানুষ ভিড় করত, কেউ জ্ঞান অর্জনের জন্য, কেউ তাঁর দরস ও সহবতের বরকত লাভের জন্য, আবার কেউ কুরআনের অন্তর্নিহিত গভীর অর্থ অনুধাবনের আশায়। তিনি মদিনার সেই সাতজন মহান ফকীহের অন্যতম ছিলেন, যাঁদের মাধ্যমে হাদিস, প্রাথমিক ফিকহ এবং কুরআনের তাফসির পরবর্তী প্রজন্মে বিস্তৃত হয়। তিনি তাবিয়িনদের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হযরত সালিম ইবন আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) ছিলেন। এভাবে তিনি সাহাবিদের পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞানধারাকে গভীরভাবে গ্রহণ করেন এবং তা পরিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণ করেন। হাদিস ও সুন্নাহ অনুসরণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য উদাহরণ। হযরত আবু যানাদ (রাঃ) বলেন, আমি তাঁর চেয়ে উত্তমভাবে নবী (সাঃ) এর সুন্নাহ অনুসরণকারী আর কাউকে দেখিনি। আমাদের যুগে কেউ তখনই পরিপূর্ণ বিবেচিত হয়, যখন সে সুন্নাহর পূর্ণ অনুসারী হয়, আর হযরত কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) ছিলেন সেই পরিপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন।

আরেক বর্ণনায় হযরত আবদুর রহমান ইবন আবি যানাদ (রাঃ) তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আমি কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) চেয়ে সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। ইমাম আবু নু'আইম আল-ইসফাহানি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হিলয়াতুল আওলিয়া তে তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি গভীরতম ফিকহী বিধান উদ্ঘাটনে সক্ষম এবং আচার-আচরণ ও নৈতিকতায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের অধিকারী ছিলেন। হযরত ইমাম মালিক ইবন আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত উমর ইবন আব্দুল আজিজ (রাঃ) বলেছেন, আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি হযরতকাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) কে আমার যুগের খলিফা বানাতাম।” তাঁর জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর বিনয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ) বলেন, একবার কিছু মানুষ তাঁর কাছে সদকা নিয়ে এলো। তিনি তা ন্যায়সঙ্গতভাবে বিতরণ করে নামাজে দাঁড়ালেন। এ সময় লোকেরা তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলতে শুরু করল। তাঁর ছেলে তাদের উত্তর দিতে চাইলে তিনি তাকে কঠোরভাবে থামিয়ে দেন এবং বলেন, চুপ করো তাদের উত্তর দিও না। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানুষের প্রশংসা বা নিন্দা তাঁর কাছে কোনো মূল্য রাখে না।

হযরত ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আনসারী (রাঃ) বলেন, আমাদের যুগে মদিনায় হযরত কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) চেয়ে উত্তম কাউকে আমরা পাইনি। আর হযরত আইয়ুব সাখতিয়ানি (রাঃ) বলেন, আমি ইমাম কাসিম (রাঃ) চেয়ে উত্তম কাউকে দেখিনি। তিনি মৃত্যুর পর তাঁর বৈধ উপার্জন থেকে এক লক্ষ দিনার গরিবদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন।

বিদায়ের পূর্বাভাস হযরত ইমাম কাসিম (রাঃ) এর আধ্যাত্মিক মাকাম ও আরাফাতের বিলাপ। গ্র্যান্ডশায়খ হযরত শরফুদ্দীন (রহঃ) বর্ণনা করেন হযরত ইমাম আবু মুহাম্মদ কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর জীবনের এক বিস্ময়কর ও গভীর আধ্যাত্মিক ঘটনা।

যে বছরে তিনি এই দুনিয়া ত্যাগ করবেন, সেই বছরের রমজানের তৃতীয় দিনে তিনি হজের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি যখন আল-কুদাইদ নামক স্থানে পৌঁছান, যেখানে সাধারণত হাজীরা বিশ্রাম গ্রহণ করে, তখন তাঁর সামনে এক অপার্থিব দৃশ্য উন্মোচিত হয়। তিনি দেখতে পান, আসমান থেকে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসছে এবং আবার ঊর্ধ্বলোকে ফিরে যাচ্ছে। তারা বারবার ওই স্থানকে পরিদর্শন করছে, যেন কোনো বিশেষ বরকত সেখানে অবতীর্ণ হচ্ছে। এই দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে এক গভীর আলো ও আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁর অন্তরে প্রবেশ করতে থাকে, যা তাঁর হৃদয়কে ইখলাস, খোদাভীতি ও আল্লাহ-সচেতনতায় পূর্ণ করে তোলে। এই অবস্থায় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে তিনি তাঁর মহান পূর্বপুরুষ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে দেখতে পান। তিনি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন, হে আমার দাদা, এ কোন আসমানী সত্তাগুলো যারা অবিরাম নেমে আসছে ও ঊর্ধ্বে উঠছে, এবং আমার হৃদয়কে আল্লাহর ভয়ে পূর্ণ করে দিচ্ছে? হযরত আবু বকর (রাঃ) উত্তর দেন, যে ফেরেশতাদের তুমি দেখছ, তারা মহান আল্লাহ তোমার কবরের জন্য নিযুক্ত করেছেন। তারা তোমার ভবিষ্যৎ শায়িত হওয়ার স্থানকে ঘিরে অবিরত বরকত গ্রহণ করছে ও বিতরণ করছে। তোমাকে সম্মান করার জন্য আল্লাহ তাদের সেখানে অবতরণ ও ঊর্ধ্বগমন করার নির্দেশ দিয়েছেন। হে আমার নাতি, মৃত্যুকে নিয়ে গাফেল হয়ো না, তোমার সময় খুবই নিকটে। তুমি শীঘ্রই এই পৃথিবী ত্যাগ করে মহান আল্লাহর দরবারে ফিরে যাবে। এই কথা শুনে ইমাম কাসিম (রাঃ) সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠেন এবং দেখেন তাঁর দাদা যেন সত্যিই তাঁর সামনে উপস্থিত। তিনি বলেন, আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, “হ্যাঁ, আমাকে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে। ইমাম কাসিম জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে কি আমার বিদায়ের সময় এসে গেছে?” তিনি উত্তর দেন, “হ্যাঁ, তুমি শীঘ্রই এই দুনিয়া ত্যাগ করে আমাদের সঙ্গে আখিরাতে মিলিত হবে।”

তখন ইমাম কাসিম (রাঃ) বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করেন, আমার জীবনের শেষ মুহূর্তে আপনি আমাকে কোন আমল করার উপদেশ দেন? হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বলেন, হে আমার সন্তান, তোমার জিহ্বাকে সর্বদা আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখো এবং তোমার হৃদয়কে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে উপস্থিত রাখো, এটাই দুনিয়ার সর্বোত্তম অর্জন। এরপর তিনি অন্তর্হিত হয়ে যান। আর ইমাম কাসিম (রাঃ) তাঁর জিহ্বা ও হৃদয়ে অবিরাম জিকির শুরু করেন এবং মক্কার পথে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি হজের উদ্দেশ্যে মক্কায় পৌঁছে সেখানে অবস্থান করেন, এবং ৯ই জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মহামহিমান্বিত দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। সেই বছরে বহু আউলিয়া পুরুষ ও নারী আধ্যাত্মিক ভাবে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন।

তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। আরাফাতের ময়দান ও পার্শ্ববর্তী পর্বতসমূহ যেন কান্নায় ভেঙে পড়ে। পাহাড়কে জিজ্ঞেস করা হলে, “তুমি কেন এভাবে কাঁদছ?” পাহাড় উত্তর দেয়, আমি এবং সকল ফেরেশতা আজ কাঁদছি, কারণ আজ এই পৃথিবী তার এক মহান স্তম্ভকে হারাতে যাচ্ছে। তারা জিজ্ঞেস করেন, কে সেই স্তম্ভ? পাহাড় বলে, হযরত আবু মুহাম্মদ কাসিম ইবন মুহাম্মদ (রাঃ) আজ দুনিয়া ত্যাগ করবেন। তাঁর পদচারণা থেকে এই পৃথিবী আর বরকত লাভ করবে না। আর আমি আর কখনো তাঁকে এই পবিত্র ময়দানে দেখতে পাব না। এজন্য আমি বিলাপ করছি। শুধু পাহাড় নয়, বর্ণনায় এসেছে, তাঁর পূর্বপুরুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ, হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং সমগ্র আধ্যাত্মিক জগৎ যেন শোকাহত হয়ে পড়ে। কারণ বলা হয়, এক আলেমের মৃত্যু মানে একটি জগতের মৃত্যু।

কাবা ও আরাফাতের শোক ইমাম কাসিম (রাঃ) এর বিদায়ের আধ্যাত্মিক দৃশ্যাবলি।

ইমাম আবু মুহাম্মদ কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর আস-সিদ্দীক Qasim ibn Muhammad ibn Abu Bakr-এর বিদায়ের প্রাক্কালে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়—যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে শোক ও করুণার এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করে। বর্ণনায় এসেছে, সেই সময় আরাফাতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবু বকর আস-সিদ্দীক Abu Bakr as-Siddiq আধ্যাত্মিকভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা অশ্রুসজল অবস্থায় বিলাপ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “কাসিমের মৃত্যুতে পৃথিবীতে এক বিরাট ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা প্রকাশ পাবে, কারণ সে এমন এক স্তম্ভ ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহ পৃথিবীকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতেন।” বর্ণনায় আরও বলা হয়, আরাফাতের ময়দানের সেই শোকময় কান্না এর আগে কেবল কয়েকটি মহা-বিচ্ছেদের সময় প্রকাশ পেয়েছিল—যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এই পৃথিবী ত্যাগ করেন, এরপর যখন আবু বকর (রা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, পরে সালমান ফারসি (রা.)-এর ইন্তেকালের সময়, এবং অবশেষে ইমাম কাসিম (রহ.)-এর বিদায়ের সময়। এক বর্ণনায় এসেছে, রাবিয়া আল-আদাবিয়া Rabi'a al-Adawiyya আধ্যাত্মিক মজলিসে ইমাম কাসিম (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিটি নিঃসাড় ও জীবিত বস্তুকে কান্নারত অবস্থায় শুনেছি। হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কি জানেন এর কারণ কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “হে রাবিয়া, আমিও এই কান্নার প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারিনি। তুমি আমার দাদা আবু বকরের কাছে জিজ্ঞেস করো।” এরপর আধ্যাত্মিকভাবে আবু বকর (রা.) উপস্থিত হয়ে বলেন, “পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে যে কান্না উঠছে, তা তোমার এই দুনিয়া ত্যাগের কারণে—যেমনটি আমি তোমাকে তোমার হজের সময় জানিয়ে ছিলাম।” তখন ইমাম কাসিম (রহ.) হাত উঠিয়ে দোয়া করেন, “হে আল্লাহ! যেহেতু আমি এখন এই পৃথিবী ত্যাগ করছি, তাই আরাফাতে আমার সঙ্গে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন।” তৎক্ষণাৎ এক অদৃশ্য আহ্বান শোনা যায়—“তোমার সম্মানে আল্লাহ সেই সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যারা এই হজে তোমার সঙ্গে আরাফাতে উপস্থিত ছিল।” এই মুহূর্তে তাঁর অন্তরে অসীম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মারিফাতের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। এরপর তিনি আরাফাত ত্যাগ করে বলেন, “হে আরাফাত! কিয়ামতের দিন আমাকে ভুলে যেয়ো না। এখানে সমস্ত নবী ও অলী অবস্থান করেছেন—তাই তুমি আমাকে কিয়ামতের দিন স্মরণে রেখো।” তখন আরাফাত পর্বত উচ্চ কণ্ঠে উত্তর দেয়—“হে কাসিম! তুমিও আমাকে কিয়ামতের দিন ভুলে যেয়ো না। আমাকে যেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শাফাআতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।” এরপর তিনি মক্কা মুকাররমায় প্রবেশ করেন এবং কাবার দিকে অগ্রসর হন। তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে—তিনি যতই কাবার নিকটবর্তী হন, ততই তিনি কাবা শরিফ থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পান, যা ক্রমে তীব্রতর হয়ে সমগ্র পরিবেশকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বর্ণনায় বলা হয়, এটি ছিল আল্লাহর ঘরের বিলাপ ইমাম কাসিম (রহ.)-এর বিদায়ের কারণে। কাবা যেন অশ্রুধারায় প্লাবিত হয়ে চারপাশকে সিক্ত করে দেয়। কাবা শরিফ বলেন, “হে কাসিম! আমি তোমাকে হারাতে যাচ্ছি, আর এই দুনিয়ায় আর কখনো তোমাকে দেখতে পাব না।” এবং এক মহিমান্বিত দৃশ্যে কাবা শরিফ তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পাঁচশতবার তাওয়াফ করে, যেন তাঁর মর্যাদাকে স্বীকৃতি প্রদান করছে। বর্ণনায় আরও বলা হয়, যখন কোনো আল্লাহর ওলি কাবা শরিফে প্রবেশ করে সালাম প্রদান করেন, তখন কাবা তার উত্তর দেয়, “ওয়া আলাইকাস সালাম, ইয়া ওয়ালিয়াল্লাহ” অর্থাৎ, “আপনার উপরও শান্তি বর্ষিত হোক, হে আল্লাহর প্রিয় বান্দা।”

বিদায়ের শেষ তাওয়াফ ইমাম কাসিম (রাঃ) এর মক্কা থেকে চিরবিদায় ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার। ইমাম আবু মুহাম্মদ কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) তাঁর পার্থিব জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে ধীরে ধীরে বিদায়ের পথে অগ্রসর হন, এক গভীর আধ্যাত্মিক নীরবতা ও মহিমায় পূর্ণ বিদায়যাত্রা। তিনি সর্বপ্রথম বিদায় জানান পবিত্র হজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) কে । এই পাথরকে কেন্দ্র করেই তাঁর জীবনের বহু তাওয়াফ ও ইবাদত সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ গভীর অনুভূতিতে নিমগ্ন থাকেন, যেন অতীতের সকল ইবাদত, অশ্রু ও সিজদার স্মৃতি একসাথে তাঁর অন্তরে ভেসে ওঠে। এরপর তিনি বিদায়ের সালাম জানান এবং অশ্রুসজল হৃদয়ে সেখান থেকে অগ্রসর হন। এরপর তিনি যান জান্নাতুল মুআল্লা কবরস্থানে, যেখানে শায়িত আছেন উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজা কুবরা (রাঃ) যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রথম সহধর্মিণী ও ইসলামের প্রথম সমর্থক।

সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সময় নীরব থাকেন। তাঁর অন্তরে এক অদ্ভুত শোক ও গভীর শ্রদ্ধা মিশে যায়, যেন তিনি নবুওয়তের প্রথম যুগের সেই পবিত্র ইতিহাসকে আবার অনুভব করছেন। এরপর তিনি পুরো মক্কা নগরীর প্রতি বিদায় জানান, যে নগরী তাঁর জীবনের ইবাদত, জ্ঞান ও মাকামকে গড়ে তুলেছিল। এরপর তিনি মক্কা ত্যাগ করে রওনা হন আল-কুদাইদ অভিমুখে, মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী একটি স্থান, যেখানে তিনি শেষবারের মতো অবস্থান গ্রহণ করেন। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সেখানে পৌঁছান ৯ই মুহররমে। সেখানেই তাঁর পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তিনি পরকালের যাত্রায় প্রবেশ করেন।

হিজরি ১০৮ বা ১০৯ (প্রায় ৭২৬ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর বছর ছিল। দীর্ঘ এই জীবনে তিনি জ্ঞান, তাকওয়া ও সুন্নাহর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। বর্ণনায় আরও উল্লেখ আছে যে, তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ও গোপন আমানত, নকশবন্দিয়া সোনালী সিলসিলার আধ্যাত্মিক ধারার ইশারা, তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি ও নাতি ইমাম জাফর সাদিক (রাঃ) এর কাছে হস্তান্তর করেন। এই জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও অন্তরের বিশুদ্ধতার এক ধারাবাহিক আলোকরেখা পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।

হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত এই অংশটি আধ্যাত্মিক গভীরতা ও ঐশী রক্ষণের এক মহিমান্বিত ইঙ্গিত বহন করে।

হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রাঃ) এর প্রসঙ্গে ‘আতাল্লাহ সুফি প্রবচন এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি জ্ঞানের এমন এক ধারার ধারক ছিলেন, যা অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যের পথে পথিকদের জন্য আলোকবর্তিকা স্বরূপ। অন্যদিকে দ্বিতীয় অংশে মহান আল্লাহর বাণী স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই আমরাই এই উপদেশ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমরাই এর সংরক্ষক। (সূরা আল-হিজর, ১৫:৯)

এর তাৎপর্য এই যে, আল্লাহর প্রদত্ত এই দিভ্য বিধান ও জীবনপথের নির্দেশনা কেয়ামত পর্যন্ত সকল বিকৃতি ও বিনাশ থেকে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত থাকবে। মানব ইতিহাসের পরিবর্তনশীলতা, মতবাদ ও সময়ের প্রবাহ কোনো কিছুই এর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করতে সক্ষম নয়; বরং এটি চিরকাল স্বয়ং আল্লাহর হিফাজতেই অক্ষয় ও অমলিন থাকবে। এমনি ভাবে ইমাম জাফর সাদিক (রাঃ) এর আধ্যাত্মিক অবস্থান এবং কুরআনের এই ঐশী প্রতিশ্রুতি, উভয়ই মিলিত হয়ে এক অনন্ত সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে হিদায়াত ও হিফাজত একমাত্র আল্লাহরই ।